ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উত্তেজনা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের ফলে নিম্নমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। খবর রয়টার্স।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার মতে, গত কয়েক মাসে ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কনীতি এবং চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো অংশীদার দেশগুলোর পাল্টা পদক্ষেপে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। পরীক্ষার মুখে পড়েছে দেশগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে আর্থিক বাজারে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
তিনি লিখিত বক্তব্যে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এ অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার ফলে খরচ বাড়বে, আমাদের নতুন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যহারে নিম্নমুখী হবে। তবে মন্দার আশঙ্কা নেই।’
বাণিজ্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী শেয়ারের দাম কমেছে। দেশগুলোর আস্থায় ফাটল ধরার বিষয়েও সতর্ক করে দিয়েছে আইএমএফ। আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে বসবে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভা। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ও অর্থমন্ত্রীরা এ সভায় ট্রাম্পের শুল্ক ও আর্থিক বাজারে অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে যেভাবে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তা আর্থিক বাজারের ওপর চাপ ও ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। সেই সঙ্গে মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড কার্ভের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখারও পরামর্শ দেন তিনি। যখন আর্থিক অবস্থা খারাপের দিকে যায়, তখন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় উল্লেখ করে জর্জিয়েভা বলেন, ‘এখনো বিশ্বের প্রকৃত অর্থনীতি মোটামুটি ভালোভাবে চলছে। মজবুত শ্রমবাজার ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো রয়েছে। তবে মন্দা নিয়ে মানুষের মধ্যে যেভাবে ভয় ও নেতিবাচক ধারণা বাড়ছে, তা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে।’
নতুন শুল্কের ঢেউয়ের মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক আরোপ করেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু দেশের জন্য এ হার আরো বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও আলোচনার স্বার্থে সেগুলো ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তবে চীন, ইইউ ও অন্যান্য দেশ এরই মধ্যে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে।
এ পরিস্থিতি দেখা দেয়ার আগে জানুয়ারিতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ঘোষণা করেছিল আইএমএফ। সে সময় ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ও ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গত মঙ্গলবার একটি সংশোধিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রকাশ করবে আইএমএফ।
এ সম্পর্কে কোনো বিশদ বক্তব্য রাখেননি সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তবে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ব্যয়বহুল হবে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের পরিণতি উল্লেখযোগ্য হবে। আইএমএফ সাধারণভাবে মুদ্রাস্ফীতিতে বড় পরিবর্তন আশা করছে না। কারণ শুল্ক একদিকে দাম বাড়াতে পারে। আবার অন্যদিকে ব্যয় কমিয়ে মূল্যস্ফীতিও কমাতে পারে। তবে সংশোধিত পূর্বাভাসে কিছু দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে বলে দেখা যাবে।’
মার্কিন শুল্কনীতি চলতি ও আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য মন্দার সূত্রপাত করবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আগামী বছর মন্দার সম্ভাবনা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মুখে জর্জিয়েভা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অন্যান্য দেশের শুল্ক ও বিধিনিষেধের কারণে এক সময় বাণিজ্য উত্তেজনা বেড়েছিল। তবে এখন তা কিছুটা কমছে। তিনি মনে করেন, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য অনিশ্চয়তা কমিয়ে ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় একমত হওয়া জরুরি। কারণ ছোট দেশগুলোয়ও এ অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ে। মার্কিন শুল্কে আকস্মিক পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি দেশগুলোকে বিবেচনাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাড়তে থাকা শুল্ক বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন জর্জিয়েভা। অতীতে দেখা গেছে, আমদানিকারকরা লাভ কমিয়ে ও ভোক্তারা বেশি দাম দিয়ে শুল্কের বোঝা বহন করেছেন। বড় অর্থনীতিগুলোয় এতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, তবে তা সময়সাপেক্ষ।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সতর্ক করে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষাবাদ উৎপাদনশীলতা কমায়, বিশেষ করে ছোট দেশগুলোয়। কারণ এটি প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই তিনি দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সংস্কার চালিয়ে যেতে, বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি, শক্তিশালী আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান বজায় রাখার আহ্বান জানান। তার মতে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর উচিত বিনিময় হারে নমনীয়তা রাখা আর উন্নত দেশগুলোর উচিত দুর্বল দেশগুলোকে আরো ভালোভাবে সহায়তা করা।
জর্জিয়েভা জানান, আজকের দিনে যখন বিশ্বের ক্ষমতা বিভিন্ন দেশে ভাগ হয়ে যাচ্ছে (বহুমেরু বিশ্ব), তখন সব দেশের মধ্যে সহযোগিতা খুব জরুরি। তিনি বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে আহ্বান জানান, যেন তারা শুল্ক কমায়, অশুল্ক বাধা হ্রাস করে ও বাণিজ্য উন্মুক্ত রাখে। এ পদ্ধতিতেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
জর্জিয়েভা বলেন, ‘বড় হোক বা ছোট—সব দেশই এখনকার অনিশ্চিত ও ধাক্কাময় সময় মোকাবেলায় দায়িত্ব নিতে পারে ও নেয়া উচিত। আমাদের এমন একটি বিশ্ব অর্থনীতি দরকার, যা স্থিতিশীল ও সহনশীল, বিভক্ত নয়।’